রাঙিয়ে দিয়ে যাও

সিদ্ধার্থ সিংহ
শ্রীকৃষ্ণ তখন একেবারেই বালক। সারা গোকুল তার দুষ্টুমিতে অস্থির। গোপিনীরা মাথায় হাঁড়ি করে ননি নিয়ে হাটে যেতে ভয় পায়, কখন দলবল নিয়ে সে হামলা চালায়! তবু সকলের কাছেই সে ছিল নয়নের মণি।
কিন্তু অন্যান্যদের তুলনায় গায়ের রং একটু চাপা হওয়ায় তার মনে নিশ্চয়ই একটা কষ্ট ছিল। তাই একদিন সে তার পালিকা মাকে বলেই ফেলল, মা,  রাধা-সহ সব গোপিনীরাই এত ফরসা, কিন্তু আমার রং কালো কেন?
এ কথা শুনে মা যশোদা ঘর থেকে কিছুটা আবির এনে তার সারা গায়ে মাখিয়ে দিলেন এবং বললেন, যাও, এই আবির সবাইকে মাখিয়ে দাও। তা হলে কেউ আর কালো বা ফরসা থাকবে না। সবাই সমান হয়ে যাবে।
মায়ের কথা শুনে সে সঙ্গে সঙ্গে ছুটল গোপিনীদের আবির মাখাতে। ব্যাস, সবাই মজা পেয়ে গেল। আর সেই যে শুরু হল,  তার পর থেকে সেই দিনটাই চিহ্নিত হয়ে গেল সবাই সবাইকে আবির মাখানোর দিন হিসেবে। আর সেই জায়গাটাও নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট হয়ে গেল দোলমঞ্চ হিসেবে। যত দিন গেল গ্রামে গ্রামে গজিয়ে উঠতে লাগল নতুন নতুন দোলমঞ্চ। যেহেতু সেই দিনটা ছিল পূর্ণিমা, তাই সবার কাছে সেটা হয়ে গেল দোল পূর্ণিমা। মানে ফাল্গুনি দোল পূর্ণিমা।
শুধু এ দেশেই নয়, এশিয়া মহাদেশের নেপাল, দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনাম,  উত্তর আমেরিকার ত্রিনিদাদ ও  টোবাগো, ওশেনিয়া অঞ্চলের ফিজি, আফ্রিকা মহাদেশের মরিশাস ছাড়াও যেখানেই ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা আছেন,  সেখানেই জাঁকজমক করে প্রতি বছর পালন করা হয় দোল উৎসব। দক্ষিণ আমেরিকার গায়ানাতে তো দোলটা  আবার রীতিমত জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের সময়ে দোল অন্য মাত্রা পায়।  নাচ,  গান, আবৃত্তি,  নাটক এই উৎসবের অঙ্গ হয়ে ওঠে। আজও প্রতি বছর দোলের দিন সকালবেলায় প্রভাতফেরি বের করে আশ্রমিকেরা। তারা দল বেঁধে— ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল লাগল যে দোল’ গানটি গেয়ে বসন্তোৎসবের সূচনা করে। সন্ধ্যাবেলায় গৌরপ্রাঙ্গণে কবিগুরুর কোনও না কোনও নাটক মঞ্চস্থ হয়।তা দেখতে শুধু এ দেশের নানা কোণ থেকেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় করে।
চোদ্দোশো এক সালে বাংলাদেশেও রঙের উৎসব শুরু হয়। সেই থেকে আজও ‘জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ’ প্রত্যেক বছর খুব ঘটা করেই আয়োজন করে এটা।  যদিও এখন তার আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অন্যত্রও।
এক সময় শুধু আবিরই ব্যবহার করা হত। বলা হত,  আবির গায়ে মাখলে নাকি বসন্ত রোগের প্রকোপ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। কিন্তু যত দিন গড়িয়েছে,  মানুষ ততই আবিরের বদলে ব্যবহার করতে শুরু করেছে বালতিতে গোলা রঙিন জল। ব্যবহার করা শুরু করেছে পিচকারি। যাতে কেউ রং দেখে ছুটে পালাতে গেলেও দূর থেকেই তাকে রাঙিয়ে দেওয়া যায়। যিনি রং মাখতে চান না,  তাকে জোর করে রং মাখানোর আনন্দই যেন আলাদা। পাড়াতুতো দেওর বউদিদের খুনসুটি মাখানো রং খেলা তো সর্বজনবিদিত। স্কুল কলেজ বন্ধ থাকে বলে আগের দিনই রংচং নিয়ে  ভূত সাজে ছাত্রছাত্রীরা। প্রচুর প্রেমের সূত্রপাতও হয় এই দিন।
তারও পরে রঙের পাশাপাশি দোলের অঙ্গ হয়ে ওঠে পঁচা ডিম, মোমের ফুচকা, মোবিল, এমনকী কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি অত্যন্ত বিপজ্জনক নানান রংও। যা হাজার চেষ্টা করেও এক-দু’দিনে ওঠানো তো দূরের কথা, এক সপ্তাহ পরে তোলাও প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। শুধু তা-ই নয়, ওই রং যে চামড়ার পক্ষে  খুবই ক্ষতিকারক, তা ব্যবহারকারীরাও জানেন। তবু ব্যবহার করেন। শোনা যায়,  ওই রঙের জন্য কারও কারও চোখও নাকি নষ্ট হয়ে গেছে।
শহরের বাইরের ছবিটা অতটা ক্ষতিকারক না হলেও বেশ কদর্য। কাছাকাছি ডোবা না থাকলে শুধুমাত্র দোলের জন্যই রাতারাতি ছোট ছোট ডোবার মতো গর্ত করে তাতে আগে থেকেই গোবর জল গুলে রাখা হয়। লোকজনকে কোলপাঁজা করে তুলে এনে সেখানে ফেলে নাকানি চোবানি খাওয়ানোর মজাই নাকি আলাদা। কোথাও আবার বালতি করে নোংরা জল লুকিয়ে লুকিয়ে এনে পেছন দিক থেকে আচমকা কারও মাথায় ঢেলে দেয়।
আর এই রং দেওয়ার অজুহাতে কিছু ছেলেপুলে কোনও কোনও মেয়ের সঙ্গে যে অশালীন ব্যবহার করে না, তাও নয়। আর তা নিয়ে দোলের দিন পাড়ায় পাড়ায় গণ্ডগোলও কম হয় না। সেই রেশ থেকে যায় বেশ কয়েক দিন।
তার ওপরে, এই দিনে বেশ কিছু উঠতি ছেলেমেয়েদের মধ্যে মদ খাওয়ার প্রতি একটা প্রবল প্রবণতা দেখা যায়। তাই প্রশাসনের তরফ থেকে বারবার আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। রাস্তায় রাস্তায় টহল দেয় সাদা পোশাকের পুলিশ। ধরপাকড় চালায় একই বাইকে তিন-চার জন মিলে হুল্লোড় করতে করতে যাওয়া উৎশৃঙ্খল বাইক আরোহীদের। ফলে এক সময় যা ছিল নিখাদ আনন্দের, রং মাখানোর পরে মিষ্টিমুখ করানোর সামাজিক রীতি, আস্তে আস্তে তা উধাও হয়ে যায়।
দোল আসলে হিন্দু সভ্যতার প্রাচীন উৎসব। তাই নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পূরাণ ও জৈমিনি মীমাংশা’তেও রঙের উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়।  তিনশো খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতেও রাজা হর্ষবর্ধনের ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ দেখতে পাই।
অনেকেই এই দোলের সঙ্গে ‘হোলি’কে গুলিয়ে ফেলেন। আসলে হোলি আর দোল কিন্তু এক নয়। সম্পূর্ণ আলাদা।
স্কন্দ পুরাণ থেকে জানা যায়, দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর ভাই হিরণ্যাকের মৃত্যু হয় বিষ্ণুর হাতে। তখন ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শোকে মুহ্যমান হিরণ্যকশিপু কঠোর তপস্যায় বসেন। তাঁর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তাঁকে বর দেন—  না জলে,  না স্থলে,  না ঘরে,  না বাইরে,  না রাতে, না দিনে, না আকাশে, না মাটিতে, না অস্ত্রে,  না শাস্ত্রে— কোথাও, কোনও কিছুতেই তাঁর মৃত্যু হবে না।  শুধু তা-ই নয়, নাগ, অসুর, দানব, গন্ধর্ব, দেবতা, পশু, মানুষ, যক্ষ, রক্ষ, কিন্নর,  দিকপাল,  লোকপাল,  প্রজাপতি— এক কথায় ব্রহ্মার যত সৃষ্টি আছে, তারা কেউই তাঁকে হত্যা করতে পারবে না।
এই বরে হিরণ্যকশিপু এতটাই ঔদ্ধত্য হয়ে উঠেছিলেন যে, ক্রমশ দেবতাদেরই তিনি অবজ্ঞা করতে শুরু করেন। বিশেষ করে বিদ্বেষী হয়ে ওঠেন বিষ্ণুর। কারণ, এই বিষ্ণুর হাতেই বধ হয়েছিল তাঁর ভাই।
তাঁর ছেলে প্রহ্লাদ যেহেতু বেশ কিছু দিন নারদের হেফাজতে ছিল, তাই সে হয়ে উঠেছিল পরম বিষ্ণুভক্ত। সে এতটাই ভক্ত হয়ে উঠেছিল যে,  সে জন্য তার নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল ‘ভক্ত’ শব্দটা। তাই প্রহ্লাদ থেকে সে সবার কাছে হয়ে উঠেছিল— ভক্ত প্রহ্লাদ।
তাঁর চরম শত্রু বিষ্ণুর  প্রতি ছেলের এই পরম ভক্তি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না হিরণ্যকশিপু। তাই সেই ভক্তি দূর করার জন্য  ছেলেকে তিনি নানা ভাবে বোঝাতে লাগলেন। লোভ দেখাতে লাগলেন। কিন্তু তাতেও কোনও ফল না হওয়ায় তাকে জব্দ করার জন্য তিনি নানা রকম শাস্তি দিতে লাগলেন। কিন্তু তাতেও ছেলের কোনও হেলদোল না দেখে তিনি শেষ পর্যন্ত কঠিন কঠোরতম পথই বেছে নিতে বাধ্য হলেন। স্থির করলেন তার মৃত্যুদণ্ড।
কখনও ক্রুব্ধ দৈত্যরাজ মশানে গিয়ে প্রহ্লাদের ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করার হুকুম দিলেন। কখনও বদ্ধঘরে বিষধর  সাপ ছেড়ে দিতে বললেন।  কখনও পাগলা হাতির পায়ের সামনে তাকে ছুড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। কখনও আবার হাত-পা বেঁধে গলায় বিশাল বড় পাথরের চাঁই বেঁধে অতল সমুদ্রে ফেলে দিতে বললেন। আর প্রতিবারই একের পর এক নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসতে লাগল ভক্ত প্রহ্লাদ।
তখন একেবারে তিতিবিরক্ত হয়ে হিরণ্যকশিপু স্মরণাপন্ন হলেন তাঁর বোনের। তাঁর বোন ছিলেন হলিকা রাক্ষুসি। তিনি তপস্যা করে দেবতাদের কাছ থেকে বর পেয়েছিলেন, আগুন তাঁকে কখনও পোড়াতে পারবে না। তাই হিরণ্যকশিপু তাঁকে পরামর্শ দেন, তাঁর ছেলেকে নিয়ে জলন্ত আগুনে প্রবেশ করার জন্য। যাতে তাঁর ছেলে আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যায়।
হিরণ্যকশিপুর নির্দেশে তাঁর লোকজনেরা প্রচুর কাঠকুঠো স্তূপীকৃত করে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। আগুন দাউদাউ করে জ্বলতেই দাদার কথা মতো ভক্ত প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে তিনি সেই আগুনের মধ্যে প্রবেশ করলেন।আগুনে ঢোকার সময় তাঁর স্মরণেই ছিল না,  দেবতারা তাঁকে বর দেওয়ার সময় একটা শর্তও চাপিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন,  তুমি যদি কখনও এটাকে অপব্যবহার করো, তা হলে এই বরের যাবতীয় গুণ নষ্ট হয়ে যাবে এবং  আগুন তোমাকে গ্রাস করবে।
যেহেতু একটা নিরাপরাধ নিষ্পাপ শিশুকে পুড়িয়ে মারার জন্য উনি আগুনে প্রবেশ করেছিলেন,  সেই অপরাধে  তাঁর সেই ‘বর’ -এর গুণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে যা হবার তা-ই হল।
হলিকা রাক্ষুসি আগুনের ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেলেন। আর সেই আগুন থেকে হরিনাম করতে করতে একদম অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এল একরত্তি বালক— ভক্ত প্রহ্লাদ।
সেই থেকেই অশুভশক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের দিন হিসেবে হলিকাদহন পালন করা হয়। হলিকা রাক্ষুসির নামেই। পরে ধীরে ধীরে অপভ্রংশ হয়ে লোকের মুখে মুখে সেটাই হয়ে যায় হলিকা দহন থেকে শুধু— ‘হোলি’। কেউ কেউ অবশ্য ‘হোরি’ও বলে।  সমস্ত ‘অপ’কে পুড়িয়ে শুদ্ধিকরণ করাই হল  এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। তাই দোলের আগের রাত্রে খড়কুটো জড়ো করে আগুন লাগানো হয়। এটাকে কোথাও বলা হয় চাঁচড়,  কোথাও নেড়া পোড়া। কিন্তু না, এখন আর কাউকেই বলতে শুনি না এর আর একটা কঠিন নাম— ‘বহ্র্যুৎসব’।
যদিও এই দুই উৎসবের সঙ্গেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত এই নেড়া পোড়া বা চাঁচর পোড়ার অন্য আর একটা আধুনিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দোল বা হোলি যেহেতু ঋতুচক্রের শেষ উৎসব, তাই উৎসবের আগেই গাছপালা থেকে ঝরে পড়া ডালপাতা, জীর্ণ, ভাঙাচোরা, পুরনো জিনিসপত্র, যেখানে যা আছে, সব এক জায়গায় জড়ো করে পোড়ানোর উদ্দেশ্যই হল চারিদিক একেবারে সাফসুতরো করা। আবার নতুন ভাবে  জীবন শুরু করা।এই নতুন ভাবে জীবন শুরু করাই হল নেড়া পোড়ার আসল লক্ষ্য।
লক্ষ্য যাই হোক, আমরা কিন্তু এই দোলকে রঙের উৎসব হিসেবেই বেছে নিয়েছি। কিন্তু রং যাতে আমাদের কোনও ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য আবির তৈরির আদিম ঘরানাকেই ফিরিয়ে আনার তোড়জোড় চলছে বহু দিন ধরেই। ছোটখাটো বিভিন্ন সংস্থা হার্বাল আবির বানাতে শুরু করে দিয়েছে।  বিভিন্ন ফুলের পাঁপড়িকে বিশেষ পদ্ধতিতে গুঁড়ো করা হচ্ছে। তার পর তাতে নানান ফুলের নির্যাস মিশিয়ে একেবারে হান্ড্রেড পারসেন্ট নির্ভেজাল এবং নিরাপদ আবির বানানো হচ্ছে। সে জন্য তাদের উদ্যোগকে বাহবা দিতেই হয়।  কিন্তু কথা হচ্ছে, সেগুলো বানাতে গিয়ে এতটাই ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে যাচ্ছে যে, সেটা আর সাধারণ লোকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকছে না। ফলে উদ্যোগ ভাল হলেও তা মুখ থুবড়ে পড়ছে।
তবু বলব, দিনের শেষে আমাদের মনে যতই কালিমা থাকুক, যতই কষ্ট থাকুক, বছরের অন্তত এই একটা দিন রঙের ছোঁয়া পেয়ে, সব দুঃক্ষকষ্টকে দূরে সরিয়ে আমরা কিন্তু রঙিন হয়ে উঠি। অন্তত রঙিন হয়ে ওঠার চেষ্টা করি।  এখানেই দোলের সার্থকতা। হোলির পরিপূর্ণতা। বসন্তের শ্রেষ্ঠ উৎসব।
(কলকাতা)
Print Friendly, PDF & Email

Related Posts