জাহালম যখন বাড়িতে পৌঁছলেন, তখন ভোররাত

ছেলেকে পেয়ে আনন্দঅশ্রুতে ভাসছিলেন জাহালমের মা মনোয়ারা; আর বলছিলেন, কার মাথায় বাড়ি দিছিলাম যে আমার এত বড় সর্বনাশ করছিল। পাড়া-প্রতিবেশীও ছুটে এসেছিলেন গণমাধ্যমের কল্যাণে সারাদেশে পরিচিত হয়ে ওঠা তাদের গ্রামের জাহালমকে দেখতে।

সাত বছর বয়সী সন্তান চাঁদনীকে কোলে নিয়ে জাহালমের মুখে তখন একটিই প্রশ্ন, তার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া এই তিন বছর কে ফেরত দেবে?

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবুড়িয়া গ্রামের মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে জাহালম নরসিংদীর একটি পাটকলে কাজ করতেন। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে থাকতেন সেখানে। ২০১৬ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মামলার আসামি ‘আবু সালেক’ হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় জাহালমকে। জাহালমের ভাষ্য, তখন তিনি বারবার বলছিলেন যে তিনি সালেক নন, কিন্তু তাতে কান দেননি দুদক কর্মকর্তারা।

এরপর থেকে কারাগারে থাকা জাহালমের ঘটনা জেনে তাকে মুক্তি দিতে আদেশ দেয় হাই কোর্ট। ওই আদেশে সোমবার প্রথম প্রহরে গাজীপুরের কাশিমপুর মুক্তি পান তিনি।

রাত ১টায় মুক্তি পাওয়ার পর ভাই জাহালমকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হন বড় ভাই শাহানূর। ভোররাত ৪টার দিকে বাড়ি পৌঁছেন তারা। বাড়ি ফেরার পরপরই মা ও পাঁচ ভাইবোনের আলিঙ্গনে আটকা পড়েন জাহালম। এরপর দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ছেলেকে ঘরে তোলেন মা মনোয়ারা।

জাহালমকে দেখতে ওই রাতেও প্রতিবেশীদের ভিড় ছিল ধুবুড়িয়া গ্রামের সেই বাড়িতে। সকাল হতে ভিড় বাড়তে থাকে, উপস্থিত হন গণমাধ্যমকর্মীরাও।

jahalam-1

জাহালম তখন তার মেয়ে চাঁদনীকে কোলে নিয়ে আছেন; চার বছর বয়সে বাবাকে প্রায় হারিয়ে ফেলা চাঁদনী কোল থেকে নামছিলই না। জাহালম তখন সাংবাদিকদের বলছিলেন তার জীবন থেকে তিন বছর হারিয়ে যাওয়ার গল্প; বিচার চাইছিলেন এরজন্য দায়ীদের।

“আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, আমি তিনটা বছর বিনা অপরাধে জেল ঘাটছি। এই তিনটা বছর আমারে কেউ ফেরত দিতে পারবে না, কিন্তু এই তিনটা বছরের ক্ষতিপূরণ যেন আমারে দেওয়া হয়।”

গরিব ঘরের ছেলে জাহালম ২০০৩ সাল থেকে নরসিংদীর জুট মিলে চাকরি করতেন। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে থাকতেন সেখানে, মাঝে-মধ্যে নাগরপুরের বাড়িতে আসতেন। জাহালম বলেন, নরসিংদীতে থাকা অবস্থায় তার এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান একদিন ফোন করেন তাকে, দেন মামলার খবর। চেয়ারম্যান সাব আমাকে ফোন করে ডেকে বলল, ‘ভাইগনা, এলাকায় আসো, তোমার নামে একটা মামলা হইছে’। আমি উনাকে বলি, আমার নামে তো কোনো মামলা-টামলা নাই। উনি বলেন, ‘না, মনে হয় আছে, তুমি এলাকায় আস’।

বাড়িতে আসার পর তিনি আমাকে একটা লোকের ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘এই ছবি কি তোমার?’ আমি বলি, না, এইটা তো আমার ছবি না। তখন তিনি বলেন, ‘কিন্তু চেহারা তো এক রকমই দেখা যায় বলে সবাই বলে’। তখন আমি উনাকে বলি, এইটা আমার ছবি না, আমি পড়ালেখা জানি না, তাই কোনোদিন টাই-টুই পরেও ছবি তুলি নাই।

সেবার চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে জাহালম পুনরায় নরসিংদী ফিরে গিয়েছিলেন। তার দুদিন পর দুদকের চিঠি আসে তার বাড়ির ঠিকানায়।

“আমার বড় ভাই আমাকে ফোন করে দুদকের চিঠির কথা জানায়। পরে দুই ভাই মিলে সেগুনবাগিচায় দুদকের অফিসে যাই। সেখানে যাওয়ার পর তারা আমাকে একটি ছবি দেখিয়ে বলে, ‘এই ছবিটা দেখছেন? এই ছবিটা তো আপনার।’

“তখন আমি বলি, জ্বি না স্যার, এই ছবিটা আমার না। তখন তারা একটা ব্যাংক একাউন্টের ছবি দেখায়। তখন উনাদের বলি, স্যার, আমি তো জীবনেও কোনো একাউন্ট করি নাই। আমি তাদের আমার আইডি কার্ড দেখাই। আমার চাকরির কাগজপত্র দেখাই। উনারা সেগুলোর ফটোকপি রাখে।”

এরপর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোড়াশাল থেকে জাহালমকে গ্রেপ্তার করে দুদক। আদালতে তোলা হলেও জাহালম বলেছিলেন, তিনি সালেক নন। কিন্তু কাজ হয়নি। সালেক হিসেবে কারাবাস শুরু হয় জাহালমের।

Print Friendly
User Rating: 0.0 (0 votes)
Sending