আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের গল্প

সাহাদাত পারভেজ
আমি যখন ঢাকা কলেজে ভর্তি হই ঠিক তার আগের বছর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার অবসরে গেলেন। তাই তাকে শিক্ষক হিসেবে পেলাম না। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্যারকে পেয়ে সায়ীদ স্যারকে না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা লাঘব হলো। সায়ীদ স্যারকে পেলাম তার অনেক পরে; সেটা আমার ক্যামেরা হাতে নেওয়ারও অনেক পর। মূলত ছবি তোলার মধ্য দিয়েই স্যারের সঙ্গে আমার একটা সখ্য সম্পর্ক তৈরি হয়।
স্যার জীবনভর আড্ডা জমিয়ে গল্প করতে পছন্দ করেন। তাই স্যারকে নিয়ে আজ আমি আপনাদের সঙ্গে কয়েকটা গল্পই করতে চাই।
একদিন ছবি তোলার জন্য খুব সকালে স্যারের সেন্ট্রাল রোডের বাসায় চলে গেলাম। স্যার আমাকে দেখে বললেন, ‘তুমি একটু বসো, আমি ১০ মিনিট ঘুমাই। তাহলে আমার চোখ দুটো ছবিতে ঠিকঠাক লাগবে।’ আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি ২০ মিনিট ঘুমান, আমি পত্রিকার পাতা উল্টাই।’
২০-২২ মিনিট পর স্যার ড্রয়িং রুমে এসে বসলেন। জানালার ফাঁক গলে সকালের একটা হালকা আলো এসে পড়ছে তার মুখে। খুবই নরম আলোয় কয়েকটা ছবি তুললাম। স্যার বললেন, দেখি কি তুলছো? ক্যামেরার মনিটরে স্যারকে ছবিগুলো দেখালাম। স্যারকে খুশি মনে হলো। বললাম, ‘স্যার, ছাদে যাওয়া যায়?’ স্যার বললেন, ‘কেন যাওয়া যাবে না? চলো।’ স্যারকে নিয়ে ছাদে চলে গেলাম। ছবি তোলার জন্য আলোটা একেবারে পারফেক্ট। টেলিফটো লেন্সে বেশ কিছু ছবি তুললাম। স্যারকে বললাম, ‘ছবি দেখবেন না স্যার?’ স্যার বলেন, দেখাও। ছবি দেখতে দেখতে স্যার বললেন, ‘বাহ, ছবিগুলোতো বেশ সুন্দর তুলছো।’ আমিও সুযোগ পেয়ে গেলাম। আমি বললাম, স্যার প্রকৃতির কাছে গেলে মানুষের মন যেমনি ভালো হয়ে যায় ছবিও তেমনি অনেক বেশি নান্দনিক হয়ে ওঠে।
স্যার বললেন, ‘তাহলে প্রকৃতির কাছে চলো, কোথায় যাওয়া যায় বলো?’
আমি বললাম, ‘কাছাকাছি তো রমনা পার্কই আছে।’
স্যার বললেন, ‘চলো রমনা পার্কে।’
আমি বললাম, ‘স্যার আজতো আপনার ড্রাইভার নাই, কেমন করে যাবেন?’
স্যার বললেন, ‘তোমার বাইকের পেছনে যাবো।’
স্যার সত্যি সত্যিই আমার বাইকে করে রমনা পার্কে গেলেন। স্যার পার্কের চেয়ারে বসে আছেন, বাতাসে তার চুল উড়ছে; রাজপুত্রের মতো পাঞ্জাবি পায়জাম আর কাধে শাল জড়িয়ে পার্কের রাস্তায় হাঁটছেন। সকালের আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে গাছ, ডালপালা আর পাতার ফাঁক দিয়ে। সেই আলো এসে পড়ছে পড়ছে স্যারের গায়ে। চারদিকে কী এক অদ্ভুৎ রকমের আলো-ছায়ার জাল ছড়াচ্ছে। আমি পুরো এক বেলা স্যারের ছবি তুললাম।
আমি এক অর্থে সৌভাগ্যবান। অনেক আলোকচিত্রী যেখানে স্যারের ছবি তোলার জন্য সিডিউল পান না, সেখানে স্যার আমাকে যখন তখন ছবি তোলার সুযোগ দেন, সময় দেন; এটা আমার জন্য এক পরম পাওয়া। একবার ছবি তুলতে গেলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। পুরো বিকেল সময় দিলেন। রুম থেকে কড়িডোর, বারান্দা, লাইব্রেরি থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত নিয়ে যাই। কিন্তু স্যারের কোনো ক্লান্তি নাই। সন্ধ্যা নেমে আসে তাও স্যারের উৎসাহে কমতি নেই। আমি বুঝতে পারি আমার সঙ্গ স্যারের ভালো লাগে। স্যারের সঙ্গে আমার ছবি তোলার, গল্প করার, আড্ডা দেওয়ার গল্প অনেক।
স্যার একবার লেখক আনিসুল হককে বলছিলেন, ‘কেন যে আমার যৌবনে সাহাদাত পারভেজের সঙ্গে পরিচয় হলো না? তখন ওর সঙ্গে পরিচয় থাকলে এখন আমার যৌবনের কত ভালো ভালো ছবি থাকতো।’ আনিস ভাই নাকি মজা করে বলছিলেন, ‘ওই সময় সাহাদাতের সঙ্গে আপনার পরিচয়ের কোনো সম্ভাবনা দেখি না। বড় জোড় ওর বাবার সঙ্গে আপনার পরিচয় থাকতে পারতো।’ এমন মজার মজার অসংখ্য গল্প করা যায় স্যারকে নিয়ে। স্যার একদিন বললেন, তুমি কেমন করে এমন ছবি তোলো? আমি বলি, আপনি যেমন করে কথা বলে চারপাশ একেবারে নিরব করে দেন। স্যার কিছু বলতে গিয়েও দমে গেলেন।
আমার কাছের মানুষেরা মনে করেন, আমি স্যারকে কিছু বললে স্যার না করতে পারেন না। তাই মাঝেমাঝে তাদের অনুষ্ঠানে স্যারকে অতিথি হিসেবে রাজি করানোর জন্য আমার কাছে অনুরোধ আসে। লজ্জার মাথা খেয়ে আমিও স্যারকে অনুরোধ করি। স্যার এখন পর্যন্ত আমার আবদার ফেলেন নাই।
একবার আমার একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে স্যার অতিথি ছিলেন। সবার শেষে তার বক্তৃতা। স্যার সবার সামনে বললেন, ‘ওর লেখা শীতের সকালে কুয়াশায় জমে থাকা শিশিরের মতো। একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না।’ ছবির পাশাপাশি আমার লেখাও ভালো লাগে; একান্ত ব্যক্তিগতভাবে স্যার বলেছেন সেসব কথা। ফলে স্যারের ছাত্র না হতে না পারার দুঃখ এখন আর নাই। আজ সুযোগ পেয়ে নিজের গল্পও করে ফেলছি।
স্যার একদিন বেশ রাতে ফোন করলেন। বললেন, ‘শোনো তোমাকে একটা কথা বলি। তুমি আমার যত ছবি তুলেছো অনন্ত উজ্জ্বলের সহযোগিতায় ডিভিডিতে ভরা তোমার সবগুলো ছবি আজ অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। তুমি আমার এত সুন্দর সুন্দর ছবি তুলেছো, দেখে মনটা ভরে গেছে। তুমি যদি এই জীবনে আর একটি ছবিও না তোলো, তাহলেও আমার আর কোনো দুঃখ নাই।’ আমি বললাম, ‘স্যার, তাহলে তো আমি শেষ। আপনি তৃপ্ত হয়ে গেলেতো আপনার কাছে আমার আর কোনো কদর থাকলো না।’ স্যার বললেন, ‘শিল্পীদের প্রতি কখনো কারো মোহ কমে না।’ স্যারের মুখে এমন কথা শুনে মনে হয়েছে আমার ফটোগ্রাফি জীবন একেবারে জলে ভেসে যায় নাই।
এক দিন খুব সকালে স্যার ফোন দিলেন। ফোন ধরতেই বললেন, ‘এত সকালে ঘুম থেকে ওঠেছো?’ আমি বললাম, ‘মেয়েদের স্কুলে দিতে যাই, তাই সকালে উঠতে হয়।’ স্যার বললেন, ‘এটা মনোযোগ দিয়ে করবা, এই সময়টা আর ফিরে পাবা না। আমিতো ঠিকমতো সময় দিতে পারি নাই তাই এখন খুব মিস করি।’ বুঝতে পারি স্যার সময়টা মিস করেন। আমার মেয়েরাও মাঝেমাঝে স্যারের কথা বলেন। বলে, তোমার স্যার এত মজার মজার কথা পায় কোথা থেকে?
স্যার একদিন তার রুমে বসে আমার সঙ্গে গল্প করছিলেন। বললেন, কেমন করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রটা করলাম জানো? স্যার বললেন বিস্তারিত। বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের না হয় হাত অনেক লম্বা, কিন্তু আমার মতো কলেজ শিক্ষকের হাততো এত লম্বা না। তবুও করলাম, ইচ্ছে ছিল বলেই করতে পারলাম। জানো, যে কোনো কিছু করার জন্য ইচ্ছেটাই থাকা লাগে।’
এই যে হাতিরঝিল, এর নেপথ্য মানুষ কিন্তু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। একদিন নাকি স্থপতি ইকবাল হাবিব স্যারের কাছে এলেন। স্যারকে বললেন, স্যার হাতিরঝিলকে নিয়ে এরকম একটা কিছু করা যায়। তখন যারা রাষ্ট্র চালান, তাদের বেশির ভাগই স্যারের ছাত্র। স্যার বললেন, চলো। হাতিরঝিল হয়ে গেলো। পরে দেখা গেল হাতিরঝিলে বসার মতো চেয়ারই নাই। স্যার বললেন, ‘এটা কিছু হয় নাই। বসার মতো জায়গা না থাকলে ছেলেমেয়েরা প্রেম করবে কোথায় গিয়ে?’ পরে হাতিরঝিলে সিমেন্টের তৈরি চেয়ার সংযোজন করা হয়। এই হচ্ছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার; অন্ধকার পৃথিবীকে স্বপ্ন দেখানোর ফেরিওয়ালা এক পথিক।
আজ তার জন্মদিন।
৮১ বছরের এই তরুণকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই।
২৫ জুলাই ২০২০
ছবি: Annonto Uzzul
Print Friendly, PDF & Email

Related Posts