দেশ গড়ার আহ্বান নিয়ে এলো স্বাধীনতা দিবস

মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান

স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার শপথ গ্রহণের মধ্যদিয়ে গর্বিত জাতি এবার উদযাপন করছে ৪৯তম মহান স্বাধীনতা দিবস।

এইদিন থেকেই আনন্দ-বেদনার মহাকাব্য চিরকালের জন্য বইতে শুরু করল বাঙালির বুকে। স্বাধীনতার এই দিনে বাঙালি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করে দেশমাতৃকার জন্য আত্মদান করা বীর সন্তানদের। স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনার এই সময়টি জাতি নিবিড় আবেগের সঙ্গে বারবার মনে করবে। আক্ষরিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়সীমা ৯ মাস হলেও এর ইতিহাস সুদীর্ঘ। সে কারণে বলা হয় ১৯৭১ সালে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি ঘরেই ছিল দূর্গ আর প্রতিটি মানুষই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। সম্মুখ সমরের বীর সেনাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছে শহর গ্রামের নারী, পুরুষ কিশোর কিশোরী সম্মিলিতভাবে। সামগ্রিকভাবে ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ছিল সকল যোদ্ধার লড়াইয়ের জীয়ন কাঠি। আর তাই বঙ্গবন্ধুর এ দৃপ্ত বাণীকে ধারণ করে বাঙ্গালীকে এখন দেশ গড়ার কাজে ঝাপিয়ে পড়তে হবে।

এবছর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ’৭১-এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। ইতোমধ্যে আমরা কিছু উদ্যোগ নিয়েছি-যেন এই দিনটা গণহত্যা দিবস হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় সেজন্য আমাদের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। জননেত্রী এই আহবান আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি এই গণহত্যা ছিল স্বাধীনতার পথে দেশের  বীরসন্তানদের প্রথম জীবনদান।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা বিজয় অর্জন করি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন সামনে নিয়ে দীর্ঘ চব্বিশটি বছর কঠিন সংগ্রাম পরিচালনা করে, নিজের জীবন উত্সর্গ করে, ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস অনেক বিস্তৃত। অনেক কষ্টের ফসল আমাদের এ স্বাধীনতা। লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত এ স্বাধীনতা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে একটি জনযুদ্ধের আদলে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ ও ই.পি.আরকে হত্যা করে এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল আওয়ামী লীগ প্রধান বাঙালিদের তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেফতারের পূর্বে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্ম-প্রকাশ করে। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই এর পূর্ব অংশ পশ্চিম অংশের তুলনায় নানাভাবে বঞ্চিত হতে থাকে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস।

মহান স্বাধীনতা দিবসের ৪৯তম দিবসে আজ গর্ব করে বলতে পারি, যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় তারই সুযোগ্য উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে আজ তা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। শিগগিরই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। আজ দেশ অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নাই। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী এবং যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সংবিধান পরিবর্তন করেছিল, রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে যারা বাতিল করেছিল, এবং যারা দেশের স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছিল- আজকে ভাবতে লাগে তারাই আজ নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে।

৭ মার্চ ভাষণে যে আহবান জাতির জনক জানিয়েছিলেন, ২৫ মার্চ রাতের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার পর পুরো ৯ টি মাস মুক্তির লড়াই চলেছে। বাঙালির জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি চূড়ান্তভাবে একটা স্বাধীন দেশ পায়। একটা স্বাধীনতা পায়। নিজেদের ন্যায্য অধিকার পায়। আজ আমরা যে একটা সুখী, সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন দেশ গড়তে চলেছি। আজকের বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশকে আজকে বাংলাদেশকে মানুষ সম্মানের চোখে দেখে। এটটুকুই আমাদের তৃপ্তি। বিশ্বে বাংলাদেশকে আমাদের নেত্রী আজ এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। এবারও জনগণ আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। মানুষের এ আস্থা ও বিশ্বাসকে সঙ্গে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এদেশটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, তাতে সন্দেহ নেই। সকল শহীদের প্রতি রইল আমার সশ্রদ্ধ সালাম।

মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান: সাধারণ সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম সংগ্রামী ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি

Print Friendly
User Rating: 0.0 (0 votes)
Sending