ধান দিয়া কী হইবো মানুষের জান যদি না থাকে

মো. আনোয়ার হাবিব কাজল

চাঁদপুর সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় আমাদের সময়কালে (১৯৮৭-৮৮) সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহর ’লাল সালু’ উপন্যাস পাঠ্য সূচীর অন্তর্ভূক্ত ছিল এবং আমার শ্রদ্বেয় আবু ইসহাক স্যার পরম যত্নে খুব মজা করেই এ উপন্যাসটি আমাদের পড়াতেন। এমনভাবে রসিয়ে রসিয়ে আমাদের পড়াতেন যে আজ এত বছর পরেও তার বেশ কিছু কথা এখনও স্মৃতি পটে জাগরুক হয়ে আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল রহিমার সংলাপ “ধান দিয়া কী হইবো মানুষের জান যদি না থাকে” এবং “তুমি এত দয়ালু খোদা, তবু তুমি কি কঠিন” আর মজিদের সংলাপ “তোমার দাড়ি কই মিঞা” এবং “কিন্তু যার অন্তরে খোদা রসূলের স্পর্শ লাগে না, তার কি আর দুনিয়াদারি ভালো লাগে”। এমনি আরো অনেক সংলাপে উপন্যাসটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

আমার আলোচনার উপজীব্য সে উপন্যাস নয়, শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি’র একটি সময়োপযোগী বক্তব্য নিয়ে। গত রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারা মুক্তি দিবস উপলক্ষে স্বপ্ন ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, “পরীক্ষা এক বছর না দিলে এমন কোনো বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে না। তিনি বলেছেন, আপনাদের সুস্থতা এবং জীবন আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে কি করা যায় আমরা সেগুলো নিয়েও ভাবছি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আপনারা বিভ্রান্ত হবেন না, ভুলপথে যাবেন না। নিজেরা নিজেদের বাড়ীতে সুস্থ থাকার চেষ্টা করুন, মানসিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য কাজ করুন, কোনো খারাপ কিছুতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলবেন না। ভয়ের কোনো কারণ নেই, পরীক্ষা দিতে হবে কি না সেটি পরের কথা। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা সুস্থ থাকুক। পরীক্ষা এক বছর না দিলে জীবনে এমন কোনো বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে না”।

আমি সরকার এবং শিক্ষামন্ত্রীর এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই তার এ বক্তব্যের সাথে একমত এবং সঠিক পদক্ষেপ বলেই মনে করি যদিও আমার সন্তানও আগামীতে এসএসসি পরীক্ষার্থী সেও দীঘ দিন ক্লাস থেকে বঞ্চিত। অনেকে হয়তো আমাকে ভুল বুঝতে পারেন, বিশেষ করে যারা বুঝে না বুঝে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন বা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

কেননা কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদারের ভাষায় বলতে হয়ঃ-
চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে
কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।

হ্যাঁ, আমি এবং আমার গোটা পরিবার ভূক্তভোগী, এ করোনায় মাত্র ৯ ঘন্টার ব্যবধানে আমি আমার বাবা-মাকে হারিয়েছি। করোনার ভয়াল থাবা আমাদের গোটা পরিবারকে অস্বস্থিকর করে তুলে। আজ এক বৎসর পার হলেও এখনও সংসারে স্বাভাবিকতা ফিরে আসেনি। বাড়েনি আত্মীয় স্বজনদের আনা গোনা। আপাতভাবে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও দৈনিক মৃত্যুহারের সাথে জীবনের গতি প্রকৃতিও ছন্দ হারিয়ে ফেলে প্রতিনিয়ত যা আমরা যারা প্রতিদিন জীবন জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হই তারা উপলদ্ধি করতে পারি। আর এখন করোনার যে ভারতীয় ভেরিয়্যান্ট বাংলাদেশে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে তা খুবই ভয়ংকর বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সুতরাং শিক্ষাকাল থেকে শিক্ষার্থীদের জীবন কালের গুরুত্ব প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছে অবশ্যই অনেক বেশী যেমনিভাবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশী। কোন অভিভাবকই চাইবে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে গিয়ে তার সন্তান করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাক। আর যদি মারা যায়ও তখন সব দায় ভার এসে সরকারের উপর বর্তাবে এবং সরকারও তখন এর দায় এড়াতে পারবে না । এখন যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে সরকারের সমালোচনায় মশগুল তারাও তখন গলা ছেড়ে সরকারের সমালোচনা করতে পিছ পা হবে না। এমনতো না যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলে সরকারকে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বোনাস দিতে হচ্ছে না। অথচ সরকার শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, ঈদ বোনাস অবিরতভাবে সরকার দিয়ে যাচ্ছে এবং আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে। শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।এতে সরকারের কোন লাভ নেই। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনার পর বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া হবে।

আমরা দেখেছি জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর পরিশ্রম আর সুযোগ্য নেতৃত্বের গুনে করোনাকালের শুরু থেকে যেভাবে তিনি বিচক্ষনতা ও দক্ষতার সাথে করোনা মেকাবেলা করে আসছেন তা সত্যিই প্রসংশার দাবী রাখে। বিশেষ করে সীমিত সম্পদও সীমিত আয়তনের ভ‚খন্ডের এ দেশে আঠারো কোটি মানুষের জীবন জীবিকা অব্যাহতভাবে গতিশীল রেখে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন কর্মকান্ড সমান তালে চালিয়ে নেয়ার যে নেতৃত্বগুন তিনি দেখিয়েছেন তা পৃথিবীতে বিরল। জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই এক সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার অবজ্ঞার সঙ্গে যে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন সেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে আরো উত্তরোত্তর অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

তাই বেঁচে থাকলে শিক্ষা-চাকরি, উদ্ভাবন সবকিছুই অর্জন সম্ভব হবে, শুধু সময়ের ব্যবধান ঘটবে। আর সে শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে যদি প্রাণে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে সে শিক্ষা কি জীবনে আদৌ কোন মূল্য বা পরিপূর্ণতা বয়ে আনবে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক, সম্মানিত সদস্য, চাঁদপুর প্রেস ক্লাব।

Print Friendly, PDF & Email

Related Posts